রাজশাহীর কাটাখালী থানার মিরকামারি এলাকায় চারটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হয়রানি, মীমাংসা-চাপ এবং প্রকাশ্য হুমকির অভিযোগে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি—স্থানীয় প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী থানার ছত্রচ্ছায়ায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
ঘটনার পটভূমি
ভুক্তভোগী মো. গোলাম মুর্তুজা, আবুল হোসেন, মো. মিলন ও শরিফুল ইসলাম সাদের অভিযোগ—স্থানীয় সিরাজুল ইসলাম কালু ও তাঁর সহযোগী মেরাজ চলাচলের রাস্তা দখল করে ইটের প্রাচীর নির্মাণ করেন, এতে চারটি পরিবারের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়।
ওই ঘটনায় শহীদ নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আদালত শান্তি–শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিলে স্থানীয় গণ্যমান্যরা প্রাচীর ভেঙে রাস্তা খুলে দেন।
কিন্তু এরপর থেকে ভুক্তভোগীরা একের পর এক হুমকি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। বাদী শহীদের আত্মীয় ফাইমাকে দেশীয় ধারালে অস্ত্র (রামদা) গলায় ঠেকিয়ে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ফলে পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
থানায় অভিযোগ, কিন্তু মামলা নয়
ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন—কাটাখালী থানায় গেলে ওসি তাঁদের ‘মামলা নয়, সাধারণ ডায়েরি করতে’ পরামর্শ দেন। এতে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হন।
তাঁদের অভিযোগ, মেরাজের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না; বরং তিনি সাবেক ডিবি সদস্যের ‘সোর্স’ পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে চলেন।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
এই বিষয়ে জানতে চাইলে কাটাখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুল মতিন প্রথমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, মেরাজ নামের কোনো ‘সোর্স’-এর বিষয়ে তাঁর জানা নেই। তিনি দাবি করেন, “মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে শাহাদ আলী (মেরাজের পিতা) গাঁজা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিনা, বা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—সে বিষয়ে ওসি কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেননি।
সমাজে প্রতিক্রিয়া: আস্থাহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, “যে ব্যক্তি পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত, তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিলে কোনো সাড়া মেলে না।”
এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ থানায় অভিযোগ দিতে ভয় পান; বরং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে আপস করাকেই নিরাপদ ভাবেন।
এতে সমাজে আস্থা ও ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি ভেঙে পড়ছে, বাড়ছে ভয়ের পরিবেশ ও আত্মরক্ষার প্রবণতা।
অনুরূপ ঘটনার নজির
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজশাহী ও দেশের অন্যান্য এলাকায় পুলিশি সোর্স বা প্রভাবশালীদের অপব্যবহারের অভিযোগ একাধিকবার উঠেছে।
গত আগস্টে রাজশাহীতেই সাবেক ডিবি সদস্য মাহবুব ও তার সহযোগী হাসানের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ক্ষোভ চরমে ওঠে—যেখানে জনতা তাদের ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, প্রভাবশালী সোর্সদের নিয়ন্ত্রণহীনতা প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা নষ্ট করছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতামত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “পুলিশের সোর্স ব্যবস্থাটি আইন প্রয়োগে সহায়ক হলেও এর কোনো জবাবদিহি না থাকায় এটি অনেক সময় হয়রানি ও দুর্নীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে।”
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর এক প্রতিনিধি জানান, “থানা যদি ভুক্তভোগীদের অভিযোগ না নেয়, সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনও বটে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনবিরোধী হতাশা বাড়ে।”
ভুক্তভোগীদের মানবিক ক্ষতি
চার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের হয়রানি ও হুমকিতে তাঁদের মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
রাতে বাইরে বের হওয়া, সন্তানের স্কুলে যাওয়া এমনকি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, “মামলা করতে গেলে হুমকি পাই, থানায় গেলে ডায়েরি করতে বলে—আমরা কোথায় যাব?”
প্রশাসনিক পদক্ষেপ জরুরি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে অবিলম্বে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—
*ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন
*থানার সোর্সদের রেজিস্ট্রি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
*অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ
রাজশাহীর মিরকামারি এলাকার এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়—এটি বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর এক চেনা চিত্র।
যখন থানার ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে যায়, তখন সমাজে ভয়, প্রতিশোধ ও অন্যায়ের সংস্কৃতি বেড়ে যায়।
এখন প্রয়োজন—নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার দৃঢ় পদক্ষেপ।